আপনি জানেন কি আপনার নামে রয়েছে কয়েকশ অবৈধ সিম ?

4 104

বেসরকারী ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে কর্মরত। স্ত্রী গ্রামে থাকেন। নিজে ব্যবহার করেন রবি কোম্পানির সিম। স্ত্রী ব্যবহার করেন গ্রামীনফোনের সিম। খরচ কমাতে স্ত্রীর অনুরোধে দোকানে গেলেন স্ত্রীর সাথে মিল রেখে গ্রামিনফেনের সিম ক্রয় করতে।

দোকানে গিয়ে সিম চাইতেই দোকানদার ভোটার আইডি ও ছবি চাইলেন। আরিফ সাহেবের কাছে তাৎক্ষনিক এসব ডকুমেন্ট ছিলনা । তাই পরে কিনবে বলে দোকান থেকে বের হয়ে যেতে চাইলেন। দোকানদার মুচকি হেসে বললেন, “আচ্ছা লাগবেনা ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”

অজ্ঞ’ খদ্দেরকে একটা সিমকার্ড ধরিয়ে দিয়ে খামের উপরে লিখে দেন আরমান সিকদার নাম, বাবার নাম, ঠিকানা। দাম বুঝে নেওয়ার পরে জানিয়ে দেন, “সার্ভিস প্রোভাইডারের ফোন এলে বলবেন, আপনার নাম আরমান সিকদার। বাবার নাম বা ঠিকানা জানতে চাইলে এগুলো আউড়ে দেবেন। আপনার সিম অ্যাক্টিভেটেড হয়ে যাবে।”

কে ওই আরমান সিকদার, যার পরিচয় বহন করতে হবে নতুন খদ্দেরকে? ঘটনা হল, ক’দিন আগে ওই দোকান থেকে মোবাইলের সিম কিনেছিলেন হাজারীবাগের বাসিন্দা আরমান সিকদার। নিয়ম মেনে, প্রয়োজনীয় কাগজ জমা দিয়ে। তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি, তাঁর সেই কাগজপত্রের সুবাদেই বেনামে একাধিক সিম বিকিয়ে যাবে অন্য লোকের কাছে।

এটা কোন গল্প নয়। বাস্তব সত্য। হ্যা আপনার নামেই দেদারছে বিক্রি হচ্ছে কয়েকশ সিম। যা ব্যবহার হচ্ছে কোন অবৈধ কর্মে। যাতে জড়িয়ে পরতে পারেন আপনিও।

যেভাবে একই ছবি বা আইডি ব্যবহার হয়: ধরুন আপনি বৈধভাবে একটি বা দুইটি বা সর্বাধিক পাঁচটি সিম কিনেছেন। যেখানে আপনি জমা দিয়েছেন আপনার ছবি ও ভোটার পরিচয়পত্রের ফটোকপি। ব্যাস এগুলো রয়ে গেলে দোকনে। দোকানদার একই ছবি বা ভোটার পরিচয় পত্রকে কপি করে দেদারছে বিক্রি করছে আরো অনেক সিম। জানা গেছে, একই ছবি দিয়ে কমপক্ষে হলেও ১০০টি সিম বিক্রি করা হয়ে গেছে।

অবৈধভাবে বিক্রিত সিমগুলোকে সচল রাখতে কোম্পানিগুলো ইচ্ছেমত ছবি নাম ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে। এর সাথে জড়িত এজেন্টগুলো যাদেরকে দেয়া হয় বর আকারে বিক্রির টার্গেট।sim-card

যে বিপদে পরতে পারেন আপনি: ধরুন আপনার ছবি এবং ভোটার পরিচয় পত্র দিয়ে বিক্রি করা হয়েছে ৪০০ সিম। সে সব সিমের মধ্যে কুখ্যাত সন্ত্রাসীও রয়েছে। কোন এক ঘটনায় সে সন্ত্রাসীর মোবাইলের সিম ট্রাক করা হল। বের করা হল পরিচয়। এতে ফেসে যেতে পারেন আপনিও।

কাজি মনজুর নামে একজন মোবাইল কোম্পনিতে চাকুরিরত বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কমকে বলেন, “আমি একটি মোবাইল অপারেটরে কাজ করছি। কাগজপত্রই সমাধান নয়। মূল সমস্যাটি অন্য জায়গায়। আমি দেখেছি একই ছবি দিয়ে প্রায় ১০-১৫ নামে সিম বিক্রি করছে খুচরা বিক্রেতা। ভূয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরী হয় যেকোন কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে। কোন অপারেটরের পক্ষে এসব যাচাই করা সম্ভব নয়।”

দেশের বিভিন্ন স্থঅনে কয়েক হাজার ভ্রাম্যমাণ সিম বিক্রেতা প্রতিদিন বিভিন্ন অফারে সিম বিক্রি করছে ৭০ থেকে ১০০ টাকায়। ওই সিম বিক্রির সময়ই ব্যাংক একাউন্ড খুলে দেওয়া হয়। এজন্যে কোন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র লাগে না। সিম বিক্রেতারা ভূয়া জাতীয় পরিচয় পত্র ও ছবি দিয়ে একাধিক সিমের কাগজের ফরম পূরণ করে দেয়। শহরের কিছু ফটোকপির দোকানদার কম দামে এই ভূয়া জাতীয় পরিচয় পত্র সরবরাহ করছে। সিমগুলো বিক্রির কিছু দিনের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক ভূক্তভোগী।

আজিজুর রহমান নামে এক ফটোকপির দোকানের কর্মচারী বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কমকে বলেন, বলেন, সিম বিক্রেতারা ফটোকপির দোকান থেকে গোপনে জাতীয় পরিচয় পত্র তৈরি করে নিয়ে যায়।

ভুক্তভোগী আসাদুল হক বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কমকে বলেন, জানান, কিছুদিন আগে একটি সিমের দোকানে আমার মোবাইল সিমে বিকাশ একাউন্ট খুলে দেয়। আমি ওই সিমে টাকা লেনদেন করেছি। হঠাৎ একটি ভুল নম্বরে আমার ৭ হাজার টাকা চলে যায়। আমি গ্রাহক সেবা কেন্দ্রে অভিযোগ করলে তারা জানান, এটি ভূয়া জাতীয় পরিচয় পত্র দিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং চালু করা হয়েছে।

আরেক ভুক্তভোগী রাশেদুল ইসলাম বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কমকে বলেন, বলেন, ভ্রাম্যমান দোকানের সিম কিনে কিছুদিন ব্যবহারের পর ওই সিম বন্ধ হয় গেছে। পরে জানতে পারি গ্রাহক সেবা কেন্দ্র থেকে কেউ উঠিয়ে নিয়েছে।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক সিম বিক্রেতা বলেন, আমি একটি জাতীয় পরিচয় পত্র দিয়ে কয়েকশ’ মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্ট খুলেছি। কিন্তু কারো কোন সমস্যা হয়নি।

ঠাকুরগাঁও প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম জানান, মোবাইল ব্যাংকিং এর জন্য সঠিক জাতীয় পরিচয় পত্র দিয়ে একাউন্ট খোলার জন্য এজেন্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা ভূয়া জাতীয় পরিচয় পত্র দিয়ে একাউন্ট খুলছেন তারা পরবর্তীতে প্রতারিত হতে পারে বলে মনে করছি।

ভূয়া নিবন্ধনে নিয়ন্ত্রণহীণ মোবাইল ফোনের অপরাধ : খন পাওয়া যাচ্ছে ভূয়া রেজিষ্ট্রেশন করা সিম। ফলে এসব সিমের ওই হুমকিদাতা বা চাঁদাবাজকে অনেক সময় সনাক্ত করতে পারে না পুলিশ বা র‌্যাব। এ নিয়ে র‌্যাব ও পুলিশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) দফায় দফায় চিঠি দেয়া হয়েছে। সিমের রেজিষ্ট্রেশন নিশ্চিত করার জন্য তারা বিটিআরসিকে বারবার অনুরোধ করেছে। কিন্তু এতদিন তা হয়নি। তবে বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, র‌্যাব-পুলিশের চিঠি পাওয়ার পর এবার রেজিষ্ট্রেশনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে অপারেটরদের চিঠি দিয়েছে।

গ্রামীনফোনই সবচেয়ে বেশি অনিয়ম করে: মোবাইল ফোন গ্রাহকদের যথাযথভাবে নিবন্ধনের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তাগিদ শুরু হয় ২০০৬ সালে। ওই বছরের ২৬ মার্চ বিটিআরসি’র বিধিমালা অনুযায়ী পুরাতন মোবাইল ফোন গ্রাহকদের জন্য জারি করা হয় পুনর্নিবন্ধন নির্দেশিকা। মোবাইল ফোন অপারেটরদের প্রস্তুতির সময় দিয়ে ২০০৬ সালের ১৬ মে থেকে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু সে নির্দেশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় জরুরি অবস্থার সরকার আমলে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়। সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয় ১৬ আগস্ট থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত। নির্দেশনায় বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যেসব গ্রাহকের পুনর্নিবন্ধনের কাজ সম্পন্ন হবে না, অথবা উল্লিখিত ঠিকানা সঠিক না হলে তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে। পুনর্নিবন্ধন করতে হবে বিটিআরসি’র গ্রাহক নিবন্ধন ফরম -২০০৬ অনুয়ায়ী। নতুন গ্রাহকদের বেলাতেও ওই ফরম ব্যবহার করা যাবে। এ ব্যবস্থায় ১৮ বছরের নীচে কাউকে গ্রাহক হিসেবে নিবন্ধন করা যাবে না বা তাকে মোবাইল ফোন সংযোগ দেয়া যাবে না।

এছাড়া বিটিআরসি থেকে নির্দেশনা জারি করা হয় যে, গ্রাহক নিবন্ধন ফরম যথাযথভাবে পূরণ ছাড়া কোনো মোবাইল ফোনের সিম বিক্রি ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরদের প্রতি সিমের জন্য ১০ মার্কিন ডলার করে জরিমানা দিতে হবে। এ নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থার উন্নতি না হলে জরিমানার পরিমাণ আরো বাড়ানো হতে পারে। গ্রাহক নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সে সময় বিটিআরসি’র সিদ্ধান্ত পত্রে বলা হয়, মোবাইল গ্রাহকরা তাদের নাম ঠিকানা যথাযথভাবে নিবন্ধন না করলে মোবাইল অপারেটরদের কোন অসুবিধা নেই। অসুবিধা নেই গ্রাকদেরও। অসুবিধা হয় শুধু সন্ত্রাসী, অপরাধী, দুর্নীতিবাজদের ফাঁদে পড়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের। ফলে ঝামেলায় পড়ে আইন-শৃক্মখলা নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনী, তদন্তকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। কোন অপরাধের তদন্ত করতে বা কোন সন্ত্রাসীকে খুঁজে বের করতে দায়িত্ব দেয়া হলে তখনই সমস্যাটি দেখা দেয়। এসব নির্দেশনার বিশ্লেষণ দেয়ার পরও লক্ষ্য পূরণ না হওয়াতে গ্রাহক পুনর্নিবন্ধনের সময় কয়েকবার বাড়াতে হয়েছে। ২০০৭ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ১৬ ডিসেম্বর এবং ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আরো দু’দফা সময় বাড়ে। তারপরও সব গ্রাহককে নিবন্ধনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। কিছু দিন পরপর বিপুল সংখ্যক সিম বিভিন্ন অভিযোগে বন্ধ করা হলেও থেমে নেই নিবন্ধনহীন সিম বিক্রি। সংশ্লিষ্টরা বলছে, দিন বদলের শ্লোগান নিয়ে আসা গ্রামীণ ফোনই সবচেয়ে বেশী অনিয়ম করছে।

সরকার যা করতে পারে: যেখানে কোম্পানিগুলো সরাসরি এই অবৈধ কর্মে সাথে জড়িত সে ক্ষেত্রে সরকার কতটুকু কি করতে পারবে না সরকার নিজেই ভাল জানে। তবে সরকার যদি সত্যিকার অর্থেই কঠোর হতে পারে তাহলে এই সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।
সূত্রঃ- বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ

4 মন্তব্য
  1. লিটন হাফিজুর বলেছেন

    শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ ——

  2. হামিদ খান বলেছেন

    একদম খাটি সত্য কথা শেয়ার করলেন, সকলের এটি মাথায় রাখা উচিত

  3. নাঈম প্রধান বলেছেন

    আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ একটি মূল্যবান পোষ্ট শেয়ার করার জন্য ।
    আশা করি আগামীতে আরও ভাল কিছু আমাদের উপহার দিবেন । ধন্যবাদ আপনাকে ।

  4. Simply Apon বলেছেন

    এইটা তো চোখের সামনেই ঘটছে!
    শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।

উত্তর দিন