বাণিজ্যিকভাবে ৩.৯জি সেবা চালু করল গ্রামীণফোন

5 129

দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন আজ মঙ্গলবার সকালে বাণিজ্যিকভাবে ৩.৯জি সেবা চালু করেছে। এ ক্ষেত্রে রাজধানীর মধ্যে আপাতত বসুন্ধরা ও বারিধারা এলাকায় সেবাটি প্রদান করা হচ্ছে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটরের মধ্যে গ্রামীণফোনই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে থ্রিজিসেবা চালু করল। গ্রামীণফোন জানায়, পর্যায়ক্রমে অন্যান্য এলাকায়ও শিগগিরই সেবাটি বিস্তৃত হবে। গ্রামীণফোনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লাইসেন্স ৩জির হলেও সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁরা এ সেবা ৩.৯ জিতে উন্নীত করতে পারবেন। সর্বোচ্চ এ সেবা পেতে হলে গ্রাহকের অবশ্য এইচএসপিএ প্লাস সহায়ক হ্যান্ডসেট থাকতে হবে।

থ্রিজি বা ৩.৯জি চালু করা নিয়ে গ্রামীণফোনের একটি ভিডিও বিজ্ঞাপন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ভিডিওটি দেখা যাচ্ছে।

২০১২ সালের ১৪ অক্টোবর রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি টেলিটক দেশে প্রথমবারের মতো থ্রিজি মোবাইল প্রযুক্তিসেবার পরীক্ষামূলক বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করে। বছর না ঘুরতেই বেসরকারি কোম্পানিগুলোও এ সেবাদানের অনুমোদন লাভ করে।

থ্রিজি লাইসেন্স পাওয়ার তৃতীয় প্রজন্ম বা থ্রিজি মোবাইলসেবা নিয়ে প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রেও তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বেসরকারি চার অপারেটর- গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও এয়ারটেলের মধ্যে প্রথমে রবি প্রচলিত থ্রিজির চেয়ে একটু বেশি ৩.৫জি সেবা দিতে যাচ্ছে বলে ঘোষণা দিয়ে চমক সৃষ্টি করে।

এরপর দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন ঘোষণা করে, তারা তাদের গ্রাহকদের জন্য দিতে যাচ্ছে ৩.৯জি সেবা, যা প্রায় ফোরজি বা চতুর্থ প্রজন্মের মোবাইল ফোনসেবার কাছাকাছি।

গ্রামীণফোনের এ ঘোষণার পর টেলিটক জানায়, তারাও ৩.৯জি সেবা দিচ্ছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হয়।

তাই বিটিআরসি এ বিষয়ে বিভ্রান্তি দূর করার জন্য সব অপারেটরকে বাড়তি কিছু না বলে শুধু থ্রিজির প্রচার চালাতে নির্দেশনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবুবকর সিদ্দিক জানিয়েছেন।

৩জি থেকে ৩.৯জি
৩জি ও ৩.৯জির মধ্যে পার্থক্য কী- এ প্রশ্নে গ্রামীণফোনের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, মূল প্রযুক্তি হচ্ছে থ্রিজি। কিন্তু এর সঙ্গে হায়ার অর্ডার মড্যুলেশন যোগ করে এ সেবাকে আরো উন্নত এবং গতিশীল করা সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘আমরা যত বেশি স্পেকট্রাম জোড়া দিতে পারব, তার ওপর ভিত্তি করে এই সেবার মান উন্নত করা সম্ভব হবে।

এইচএসপিএ (হাই স্পিড প্যাকেট অ্যাকসেস) প্রযুক্তির পরের ভার্সনের বা এইচএসপিএ প্লাসের ব্যবহার এ ব্যাপারে আমাদের আরো সহযোগিতা দেবে।’

স্পেকট্রাম জোড়া লাগানোর বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের দুটি ব্লকের ১০ মেগাহার্টজ থ্রিজি স্পেকট্রাম রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের থ্রিজি ক্যারিয়ার দুটি।

এই দুটি ক্যারিয়ার একসঙ্গে ব্যবহার এবং অ্যান্টেনা কম্বিনেশন করে থ্রিজিকে প্রায় ফোরজির কাছাকাছি নেওয়া সম্ভব। গ্রামীণফোন সেটাই করতে যাচ্ছে।’

থ্রিজিতে যেসব সেবা মিলবে
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এ সেবার মাধ্যমে মোবাইল ফোনে দ্রুতগতির ইন্টারনেট ছাড়াও টিভি দেখার সুযোগ থাকছে। থ্রিজিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হতে পারে ভিডিও কল।

এতে মোবাইল ফোনে কথোপকথনের সময় দুই পক্ষেরই ছবি দেখা যাবে। পরস্পরের অবস্থানও জানা যাবে। আধুনিক প্রযুক্তির এই সেবার মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও উন্নত হবে। অফিসে বসেই কোনো একটি স্থানে কী ঘটছে, তা পর্যবেক্ষণ করা যাবে।

শহরের সব সড়কের গাড়ির গতিবিধি দেখে ট্রাফিক পুলিশ অনাকাঙ্ক্ষিত যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। দ্রুতগতির ইন্টারনেটের কারণে ই-কমার্স, ই-স্বাস্থ্য, ই-শিক্ষা, ই-গভর্ন্যান্স- এসব সেবার মান বাড়বে।

তবে এসব সেবা পাওয়ার জন্য থ্রিজি উপযোগী হ্যান্ডসেট থাকতে হবে।

হ্যান্ডসেটের বিষয়ে গ্রামীণফোনের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘যে হ্যান্ডসেটগুলোতে এইচএসপিএ প্লাস প্রযুক্তির সুবিধা রয়েছে শুধু সেগুলোতেই ৩.৯জি সেবা গ্রহণ করা যাবে।

তবে আমাদের জানা মতে অনেক স্মার্টফোনে এইচএসপিএ সাপোর্ট করলেও এইচএসপিএ প্লাস সাপোর্ট করে না।’

এদিকে জানা যায়, বিশ্বের কয়েকটি দেশে থ্রিজি সেবা চালুর পর ওই সেবাকে ৩.৯জিতে উন্নীত করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতি নিতে হয়েছিল।

থাইল্যান্ডে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। তবে অনেক দেশেই থ্রিজিকে ৩.৫, ৩.৭৫ বা ৩.৯জিতে উন্নীত করতে আলাদা করে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও নেপাল এর উদাহরণ।

এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আবুবকর সিদ্দিক বলেন, থ্রিজি, ৩.৫জি, ৩.৭৫জি এবং ৩.৯জি একই পরিবারভুক্ত।

এর মূল হচ্ছে থ্রিজি। একেক অপারেটর একেক ধরনের স্লট ব্যবহার করে এ সেবাকে ফোরজির প্রায় কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।

এর জন্য আলাদা কোনো অনুমতির দরকার নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে যাতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়, সে জন্য বাড়তি কিছু না বলে প্রচারের ক্ষেত্রে শুধু থ্রিজি বলতে বিটিআরসি সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের নির্দেশনা দিতে যাচ্ছে।

প্রথম গ্রামীণফোনের থ্রিজি সেবা গ্রহণকারী
বসুন্ধরা গ্রুপ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল জানায়, গ্রামীণফোনের থ্রিজি সেবা গ্রহণকারী প্রথম কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বসুন্ধরা গ্রুপ।

আজ সকাল সাড়ে ১০টায় বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং গ্রামীণফোনের সিইও বিবেক সুদ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ সেবা উদ্বোধন করেন।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বসুন্ধরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল হেডকোয়ার্টারে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

প্রতিযোগিতায় অপারেটররা
বেসরকারি অপারেটরগুলোর মধ্যে রবি গত ১০ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, এ বছরের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও সিলেটে রবির এ সেবা চালু হবে।

প্রচলিত ৩জি নয়, রবি এইচএসপিএ (হাই স্পিড প্যাকেট অ্যাকসেস) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৩.৫জি সেবা দেবে।

এরপর ২৯ সেপ্টেম্বর গ্রামীণফোন তাদের থ্রিজি নেটওয়ার্কের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জানায়, তারা যে স্পেকট্রাম বরাদ্দ পেয়েছে, এতে তাদের সারা দেশে ৩.৯জি পর্যন্ত নেটওয়ার্ক বিস্তারে এবং সব গ্রাহককে তাৎক্ষণিকভাবে ইন্টারনেট সেবা দিতে সক্ষম হবে।

এই দিন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনেও গ্রামীণফোন তাদের ৩.৯জি সেবার বিষয়টি প্রচার করে। পরে টেলিটকও তাদের থ্রিজি সেবা চালুর এক বছর পর পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানায়, তারাও ৩.৯জি সেবা দিচ্ছে।

গত ৮ সেপ্টেম্বর থ্রিজি স্পেকট্রাম নিলামের পরের দিন ৯ সেপ্টেম্বর গ্রামীণফোন সংবাদ সম্মেলনে জানায়, তারা অক্টোবর মাসের মধ্যেই রাজধানী ঢাকা এবং বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের নির্বাচিত এলাকায় থ্রিজি সেবা চালু করতে যাচ্ছে।

নভেম্বরে চালু হবে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ ঢাকা নগরীর সম্পূর্ণ এলাকায়। দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে থ্রিজি সেবা চালু হবে ডিসেম্বরের শেষ দিকে। আর সারা দেশের ৬৪ জেলায় চালু হবে আগামী মার্চে।

২৫ সেপ্টেম্বর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম টেলিকম অপারেটর বাংলালিংকও অক্টোবর থেকে বাণিজ্যিকভাবে তৃতীয় প্রজন্ম বা থ্রিজি প্রযুক্তির মোবাইল ফোন সেবা চালুর ঘোষণা দেয়।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জিয়াদ সাতারা এ দিন রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলালিংকের পরীক্ষামূলক থ্রিজি সেবার উদ্বোধন করে জানান, তাঁরা অক্টোবরে ঢাকা এবং চলতি বছরের মধ্যেই চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনায় এ সেবা শুরু করতে যাচ্ছেন।

এরপর ২ অক্টোবর এয়ারটেল বাংলাদেশ লিমিটেড ঢাকায় তাদের কর্পোরেট অফিসে ‘এয়ারটেল থ্রিজি এক্সপেরিয়েন্স জোন’ চালুর ঘোষণা দিয়ে জানায়, এ মাসের মধ্যেই তাদের ঢাকা ও চট্টগ্রামের গ্রাহকদের কাছে থ্রিজি সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

নভেম্বরের মধ্যে সিলেটের প্রধান প্রধান এলাকায় এ সেবা চালু করা হবে। আগামী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ এই তিন প্রধান বিভাগের সব এলাকা থ্রিজির আওতায় নিয়ে আসা হবে।

২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে সাতটি বিভাগীয় সদরে এবং ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো দেশে থ্রিজি সেবা চালুরও আশ্বাস দেয় এয়ারটেল।

এছাড়া টেলিটক আগামী ১০ অক্টোবরের মধ্যে দেশের সবগুলো বিভাগে থ্রিজি সেবা চালু করতে পারবে বলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মুজিবুর রহমান প্রিয়.কমকে নিশ্চিত করেছেন।

5 মন্তব্য
  1. আকাশ বলেছেন

    চমৎকার পোস্টটি শেয়ার করার জন্য থ্যাংকস ভাই!

  2. নাঈম প্রধান বলেছেন

    শেয়ার করার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

  3. দিপু রায়হান বলেছেন

    ধন্যবাদ আমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য।

  4. হামিদ খান বলেছেন

    ধন্যবাদ………

  5. লিটন হাফিজুর বলেছেন

    thanks for share.

উত্তর দিন