অনলাইনে পড়া-লেখা (দ্বিতীয় পর্ব)

0 943

আসসালামু আলাইকুম,

প্রায় ১ বছর আগে অনলাইনে পড়ালেখা নিয়ে একটি পোষ্ট করেছিলাম, আজকে সেই পোষ্টের ধারাবাহিকতায় বিস্তারিত আলোচনা করবো।

 

একটা সময় ছিল যখন স্কুল,কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই পড়ালেখা সীমিত ছিল। আর যাদের সামর্থ্য থাকতো তারাই বড় আর নামীদামী সব বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে পারতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির উন্নতির কারনে প্রায় সকল ক্ষেত্রেই আমরা এর সুফল ভোগ করছি। আর এখন অনলাইনের শিক্ষাপদ্ধতির মাধ্যমে যে কেউ খুব সহজেই যে কোন স্থান হতে শিক্ষা গ্রহন করতে পারছে।

 

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, এমআইটি ইউনিভার্সিটি, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অফ পেনসেলভেনিয়া, ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলম্বিয়া সহ আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যা অনেকের কাছে সপ্নের মত। কিন্তু বর্তমানে আপনি চাইলেই ঘরে বসেই সেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের লেকচার খুব সহজেই পেয়ে যাবেন, এবং আপনার পছন্দের বিষয়ের উপর কোর্স বা রিসার্চ করতে পারবেন। আর সকল বিষয়ের জন্য পাবেন পৃথিবীর সেরা সব জিনিয়াস এক্সপার্টদের, সকল জটিল বিষয় গুলো খুব সহজভাবে বোঝানোর জন্য তারা রয়েছেন। শেখার আগ্রহ,অধ্যবসায় আর নিয়মিত ক্লাস করলেই আপনি আপনার স্বপ্ন পুরন করতে পারবেন।

 

পিসি বা ল্যাপটপ ছাড়াও প্রায় সকলেরই স্মার্টফোন রয়েছে, আর সকল অনলাইন লার্নিং সাইট গুলোর প্লে স্টোরে অ্যাপ রয়েছে। ফলে বিশ্বের যে কোন প্রান্ত হতে, যে কেউ নিজের সুবিধা মত খুব সহজেই তার পছন্দের বিষয় নিয়ে অনলাইনে স্টাডি,কোর্স বা রিসার্চ করতে পারে। আর বর্তমানে অনলাইনে পড়ালেখা এবং কোর্সের চাহিদা অনেক এবং দিন দিন জনপ্রিয়তা বেড়েই চলছে। লার্নিং সাইট গুলোতে ইংরেজি,বাংলা সহ বিশ্বের জনপ্রিয় প্রায় সকল ভাষাতেই লেকচার রয়েছে।

 

নির্ধারিত সময়ে অনলাইনে পরীক্ষা দেয়ার পর আপনি পেয়ে যাবেন তার ফলাফল এবং সার্টিফিকেট। কোর্স কমপ্লিট করার পর আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন আমাদের দেশের শিক্ষা আর অন্যান্য দেশের শিক্ষার পার্থক্য। অনলাইনে অনেক লার্নিং সাইট রয়েছে তার মধ্যে আমার দেখা সেরা কয়েকটি সাইট নিয়ে আজকে আলোচনা করবো।

 

 

কোর্সেরা

২০১২ সালে স্ট্যানফোর্ডের দুই জন প্রফেসর এর দ্বারা কোর্সেরা প্রতিষ্ঠাপিত হয়, তারা চেয়েছিল তাদের জ্ঞান পুরো বিশ্বের সাথে শেয়ার করা। যার মাধ্যমে যে কেউ, যে কোন জায়গা হতে শিক্ষা গ্রহন করতে পারে। প্রায় ৩৫ মিলিয়ন শিক্ষার্থী, সহযোগী হিসেবে রয়েছে বিভিন্ন দেশের ১৫০ টির মত বিশ্ববিদ্যালয়, ২৭০০ এর মত পেইড এবং ফ্রি কোর্স, এবং ২৫০ জন বিশেষজ্ঞ রয়েছে কোর্সেরা তে।

ওয়েব সাইট https://www.coursera.org

 

ইডিএক্স

২০১২ সালে হার্ভার্ড এবং এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে ইডিএক্স। আর ইডিএক্স হল একটি বিশাল ওপেন অনলাইন কোর্স প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। তাদের লক্ষ্য সবার জন্য উন্নত শিক্ষা। তাদের সাথে রয়েছে প্রায় ১৪ মিলিয়ন শিক্ষার্থী, ১৮০০ এর মত অনলাইন কোর্স এবং সহযোগী হিসেবে রয়েছে বিভিন্ন দেশের ১২০ টির মত বিশ্ববিদ্যালয়, এছাড়াও অনেক সংস্থা এবং এনজিও।

ওয়েব সাইট https://www.edx.org

 

খান একাডেমী

২০০৮ সালে সালমান খান প্রতিষ্ঠা করেন খান একাডেমী এবং তাদের স্লোগান “সকলের জন্য সব জায়গায় বিনামূল্য বিশ্বমানের শিক্ষা” এখানে আপনি উন্নত শিক্ষা গ্রহন করতে পারবেন সম্পূর্ণ ফ্রি তে, যে কোন সময়, যখন ইচ্ছা। এবং ২০১৮ সালে খান একাডেমী কিডস চালু হয় সেখানে ২ থেকে ৬ বছরের শিশুদের জন্য রয়েছে ফ্রি তে শিক্ষাবিষয়ক অনেক প্রোগ্রাম।

ওয়েব সাইট https://www.khanacademy.org

 

লিন্ডা

১৯৯৫ সাল প্রতিষ্ঠিত হয় লিন্ডা, প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন লিন্ডা ওয়েইনম্যান এবং ব্রুস হেভিন। তারা ২০০২ সালে অনলাইন কোর্স চালু করে। তাদের রয়েছে বিশ্বসেরা এক্সপার্ট যারা তাদের জ্ঞান সকলের সাথে শেয়ার করতে উৎসাহী। বভিন্ন বিষয়ের উপর রয়েছে তাদের অনেক কোর্স, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ৬০০ কোর্স, ডিজাইন ৭০০ কোর্স, বিজনেস ১২০০ কোর্স, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ৭০০ কোর্স এবং ফটোগ্রাফি ৭০০ কোর্স। ১ মাসের ফ্রি ট্রায়াল শেষে প্রতি মাসের জন্য ৩০ডলার ফি দিতে হবে। (Lynda.com is now Linkedln Learning)

ওয়েব সাইট https://www.lynda.com

 

উডেমি

২০১০ সালে এরেন বালি উডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি একটি অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম। রয়েছে বিভিন্ন বিষয়ের উপর রয়েছে প্রায় ১ লক্ষ অনলাইন কোর্স, আর তাদের কোর্স ফি ১১ডলার থেকে শুরু। এবং শিক্ষক হিসেবে রয়েছে বিশ্ব সেরা বিশেষজ্ঞরা।

ওয়েব সাইট https://www.udemy.com

 

স্কিলশেয়ার

২০১০ সালে মাইকেল এবং ম্যালকম ওং শুরু করেন স্কিলশেয়ার। এখানে রয়েছে বিভিন্ন ক্যাটাগরির প্রায় ২৭০০০ অনলাইন ক্লাস, ৪মিলিয়ন শিক্ষার্থী। রয়েছে ফ্রি মেম্বারশীপ এবং প্রিমিয়াম মেম্বারশিপ ১ বছরের জন্য ৯৯ডলার আর ১ মাসের জন্য ১৫ ডলার।

ওয়েব সাইট https://www.skillshare.com

 

এলিসন

চালু হয়েছিল ২০০৭ সালে, এলিসন একটি ফ্রি অনলাইন এডুকেশন প্লাটফর্ম। UN এর (সবাই বিনামূল্যে শিক্ষার অধিকারী) এই ঘোষণার দ্বারা তারা অনুপ্রাণিত হয়। বর্তমানে ১৯৫টি দেশের প্রায় ১৩ মিলিয়ন শিক্ষার্থী, ১.৫মিলিয়ন গ্র্যাজুয়েট এবং প্রায় ১০০০ কোর্স রয়েছে।

ওয়েব সাইট https://www.alison.com

 

ইসলামিক অনলাইন ইউনিভার্সিটি

২০০৭ সালে ডঃ বিলাল ফিলিপ্স চালু করেন IOU। এর সাথে যুক্ত রয়েছে ২২৪টি দেশের প্রায় ১লক্ষ ৮০হাজার শিক্ষার্থী। আরবি ভাষা শিক্ষা সহ আরো অনেক ইসলামিক ডিগ্রী প্রোগ্রাম রয়েছে। বর্তমানে প্রায় চারলক্ষ আশি হাজার রেজিস্টার শিক্ষার্থী রয়েছে IOU তে। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ে ফ্রি এবং পেইড কোর্স রয়েছে।

ওয়েব সাইট https://www.islamiconlineuniversity.com

 

শিক্ষক

২০১২ সালে যাত্রা শুরু হয় শিক্ষক ডট কম এর। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ডঃ রাগিব হাসান। ২০০৬ সাল থেকে তিনি কাজ করছেন বাংলা উইকিপিডিয়া তে। বাংলা ভাষার মুক্ত জ্ঞানের প্রকাশ ও বিকাশের একটি অসাধারণ অনলাইন প্লাটফর্ম। রয়েছে বিভিন্ন বিষয়ের উপর অনেক লেকচার। তাদের লক্ষ্য ফ্রি তে অনলাইন শিক্ষা, বাংলা ভাষায় বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার গ্রামীণ এবং সুবিধাবঞ্চিত শিখার্থীদের কাছে উন্নত শিক্ষা পৌঁছে দেয়া। আপনি চাইলে শিক্ষক হিসেবেও যোগ দিতে পারবেন আর শেয়ার করতে পারবেন আপনার জ্ঞান।

ওয়েব সাইট https://www.shikkhok.com

 

 

আপনারা যারা নতুন, এবং অনলাইনে পড়ালেখা শুরু করতে চান তারা প্রথমে ফ্রি তে শিখুন। যদি ইংরেজি জানা থাকে তবে আপনার জন্য খুব সহজ হবে। আর একসাথে অনেকগুলো কোর্স না করে, আপনি একটি কোর্স শেষ করে পরের কোর্স শুরু করুন। আর সার্টিফিকেটের পেছনে না দৌড়ীয়ে জ্ঞান অর্জনের জন্য শিখুন ইন-শা-আল্লাহ্‌ আপনি সফল হবেন।

যে কোন কিছু করার আগে সেই বিষয় সম্পর্কে সকল তথ্য জানুন। আপনার পরিচিত যারা রয়েছে তাদের কাছ থেকে মতামত নিন। এছাড়া যে কোন সমস্যার জন্য গুগলের সাহায্য নিন, আর ইউটিউবে পাবেন বিভিন্ন বিষয়ের উপর অনেক টিউটোরিয়াল। অনলাইনে কাজ করানো বা শেখানর নামে অনেকেই টাকা নিয়ে নিয়ে থাকে তাদের থেকে সতর্ক থাকুন।

 

আপনার পিসি/ল্যাপটপ/স্মার্টফোন হল আপনার জ্ঞান অর্জনের প্রধান হাতিয়ার, অবসর সময়গুলো জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারেন। আপনার এই জ্ঞান ভবিষ্যতে হয়তো কাজেও লাগতে পারে। শেখার কোন শেষ নেই, জ্ঞান অর্জন করুন এবং শেখার পর আপনার জ্ঞান সকলের সাথে শেয়ার করুন।

 

অনলাইনে আমার অভিজ্ঞতাঃ

গ্রাফিক্স ডিজাইন শেখার জন্য আমাদের দেশের পরিচিত কিছু ট্রেনিং সেন্টার, সাথে অনলাইনে গ্রাফিক্স ডিজাইনের অনেক টিউটোরিয়াল ফলো করতাম। এরপর অনলাইনে লিন্ডা র ফটোশপ এর কোর্স করলাম, আর বুঝতে পারলাম পার্থক্য। সেখানে ছিলেন অভিজ্ঞ সব জিনিয়াসরা, তারা জটিল বিষয়গুলোকে খুব সহজে বুঝিয়ে দেন। এরপর পর থেকেই অনলাইন শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়।

 

শেষ কথাঃ

ধন্যবাদ দিলেও কম হয়ে যাবে সেই সকল ওয়েবসাইট এবং তাদের প্রতিষ্ঠাতাদের, যাদের এই অসাধারণ উদ্যোগের কারনে শিক্ষা পদ্ধতির চেহারাই পাল্টে গেছে এবং প্রতিনিয়ত খুব সহজেই সকলের নিকট শিক্ষা পৌঁছে যাচ্ছে।

 

উত্তর দিন