ওয়েবের ত্রিশ বছর, এর পরে কী?

0 737

তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম নিয়ে আমার মূল প্রস্তাব থেকে ত্রিশ বছর পর বিশ্বের অর্ধেক মানুষ আজ ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত। এই সময়ে আমরা অনেক দূর এসেছি। এখন এটি ভাবার সময় যে, আর কতদূর আমাদের যেতে হবে।

ওয়েব এখন আর শুধু তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়। ওয়েব এখন পাবলিক স্কয়ার, লাইব্রেরি, দোকান, সিনেমা, হাসপাতাল, ডাক্তারের অফিস, স্কুল, ডিজাইন স্টুডিও, ব্যাংক ইত্যাদিসহ আরো অনেক কিছু। হ্যাঁ, প্রত্যেকটি নতুন ওয়েবসাইট, নতুন ফিচারের মাধ্যমে অনলাইন ও অফলাইন মানুষের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। এই ব্যবধানকে দূর করতেই ওয়েবকে সবার উপযোগী করে তুলতে হবে, ওয়েবকে সবার কাছে পৌঁছাতে হবে।
ওয়েব আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে দিয়েছে বলার মাধ্যম, সৃষ্টি করেছে বিভিন্ন সুযোগ। কিন্তু একই সাথে সাইবার অপরাধ করার চমৎকার সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। ঘৃণা ছড়ানোর সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর মাধ্যম এখন ওয়েব। প্রতারণা করার আদর্শ স্থান হচ্ছে এই ওয়েব, যেখানে প্রতারকেরা প্রতিনিয়তই বিভিন্ন প্রকার অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে।

ওয়েবের নানান অপব্যবহার নিয়ে খবরগুলো দেখে সহজেই অনুমান করা যায় যে কিছু মানুষ ওয়েবকে ভয় পায় এবং ওয়েব আসলেই ভালো কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে। গত ত্রিশ বছরে ওয়েবের পরিবর্তন লক্ষ করে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বর্তমানের ওয়েবকে আগামী ত্রিশ বছরে ভালোর দিকে নিয়ে যাওয়া যাবে না। আমরা যদি এখন ওয়েবকে ভালো করার দিকে মনোযোগ না দিই, তো এর দায় ওয়েবের নয়, সম্পূর্ণ আমাদের হবে।

কোনো সমস্যা সমাধান করতে হলে প্রথমে সমস্যাটিকে ভালো করে চিহ্নিত করতে হবে। আমি মোটামুটি নিচের তিনটি সমস্যা দেখতে পাই যেগুলো আজকের ওয়েবকে কলুষিত করছে:
১) বিদ্বেষপূর্ণ ইচ্ছা – রাষ্ট্র নির্দেশিত সাইবার হামলা, হ্যাকিং, সাইবার অপরাধ, হয়রানি ইত্যাদি।
২) বিকৃত উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী সিস্টেম – যেখানে ব্যবহারকারীর মূল্যবোধকে বলি দেওয়া হয়। যেমন: ক্লিকবেট জাতীয় বাণিজ্য এবং অপতথ্য প্রচার।
৩) ভালো কোনো সিস্টেমের অনাকাঙ্ক্ষিত নেতিবাচক পরিস্থিতি – কোনো বিষয়ের ওপর ব্যক্তি/দলের ক্রোধান্বিত ও একপেশে বক্তব্য।

প্রথম প্রকারের সমস্যা পুরোপুরি দূর করা অসম্ভব। একে নিয়ন্ত্রণ করতে বিধিনিষেধ ও আইন প্রয়োগ করা যেতে পারে, সাধারণ অপরাধের জন্য যে রকম আইন থাকে। দ্বিতীয় প্রকারের সমস্যা দূর করতে আমাদের এমন সিস্টেম ডিজাইন করতে হবে যা আমাদের এসব উদ্দীপনা থেকে দূরে রাখবে। তৃতীয় প্রকারের সমস্যা দূর করতে আমাদের গবেষণা করতে হবে। প্রয়োজনে সম্ভাব্য নতুন সিস্টেম বানাতে হবে বা বর্তমান সিস্টেমে যথাযথ পরিবর্তন আনতে হবে।

শুধু সরকার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা মানুষের প্রকৃতিকে দোষ দিলে হবে না। সমস্যার লক্ষণগুলোর পেছনে ছুটলে আমাদের হতাশা ছাড়া আর কিছুই আসবে না। আমাদের নজর দিতে হবে সমস্যার গোড়ায়। আর এটি করতে হলে পুরো বিশ্বকে একত্রে এগিয়ে আসতে হবে।

যুগ পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে আমাদের পূর্বের প্রজন্ম একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য একসাথে কাজ করতে এগিয়ে এসেছিল। সার্বজনীন মৌলিক অধিকার ঘোষণার সময় নানা জাতের মানুষ প্রয়োজনীয় নীতিতে একমত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। সমুদ্র আইন ও মহাকাশ চুক্তির মাধ্যমে আমরা সবার স্বার্থে নতুন সীমানা নির্ধারণ করতে পেরেছি। এখন যেহেতু ওয়েব পৃথিবীকে নতুন রূপ দিতে যাচ্ছে, আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে একে মানুষের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং সকলের কল্যাণের জন্য তৈরি করা। এই উদ্দেশ্যে একটি নতুন চুক্তি তৈরি করার জন্য ওয়েব ফাউন্ডেশন বিভিন্ন সরকার, কোম্পানি ও সাধারণ মানুষজনের সাথে কাজ করে যাচ্ছে।

এই চুক্তিটি লিসবনের ওয়েব সামিটে উত্থাপিত হয়েছিল যা এমন কিছু মানুষকে একত্র করেছে যারা মনে করে আমাদের ওয়েবকে নিয়ম-শৃঙ্খলা, নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও আইনের অধীনে আনতে হবে। যারা এই চুক্তির পক্ষে আছেন তারা এর বিভিন্ন প্রাথমিক নীতি মেনে নিয়ে নিজ নিজ ক্ষেত্রে নীতিগুলোকে বাস্তবায়ন করতে কাজ করে যাচ্ছেন। এই কাজ কোনো দল একা করবে না এবং এতে সবার মতামত সাদরে গ্রহণ করা হবে। বিভিন্ন সরকার, কোম্পানি এবং সাধারণ মানুষ এতে অংশ নিচ্ছে। এই বছরের শেষের দিকে আমরা একটা ফলাফল আশা করছি।

প্রত্যেক সরকারকে অবশ্যই সকল নিয়ম-নীতি ও আইন ডিজিটাল যুগের উপযোগী করে তুলতে হবে। তাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যেন বাজার প্রতিযোগিতামূলক, উদ্ভাবনমুখী ও সবার জন্য খোলা হয়। অনলাইনে জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা করাও সরকারের দায়িত্ব। সরকারের মাঝে আমাদের কিছু কর্মচারী ও নির্বাচিত প্রতিনিধি তৈরি করতে হবে যারা ওয়েবকে নিরাপদ রাখতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে। কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানির স্বার্থ যদি জনসাধারণের ক্ষতির কারণ হয়/হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে তো সেটা প্রতিরোধ করা হবে তাদের অন্যতম কাজ।

কোম্পানিগুলো যেন জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র বা জনসাধারণের নিরাপত্তার বিনিময়ে সাময়িক লাভের আশা না করে। প্লাটফর্ম এবং প্রডাক্টগুলো অবশ্যই গোপনীয়তা, বৈচিত্র্য ও নিরাপত্তার দিক চিন্তা করে ডিজাইন করতে হবে। এ বছর আমরা দেখেছি কিছু প্রযু্ক্তিকর্মী নৈতিকতা বজায় রেখে ব্যবসা চর্চার পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহন করেছে। এই সাহসকে আমাদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটি, জনগণকে অবশ্যই সরকার ও কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তারা যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা যেন রক্ষা করে। পাশাপাশি ওয়েবকে তারা যেন একটি বৈশ্বিক সম্প্রদায় হিসেবে সম্মান করে। আমরা যদি এমন কাউকে নির্বাচিত না করি, যে মুক্ত ও নিরাপদ ওয়েবকে সমর্থন করে, এর জন্য কাজ করে, আমরা যদি ইন্টারনেটে গঠনমূলক ও সুস্থ আলোচনা করার অভ্যাস না করি, আমাদের তথ্য অধিকার রক্ষায় নিশ্চিত না হয়ে যদি কোম্পানিগুলোর শর্তাবলী (terms and conditions) মেনে নিতে থাকি, তাহলে এগুলোকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডায় পরিণত করার দায়িত্ব থেকে আমরা সরে যাচ্ছি।

ওয়েবের জন্য এই লড়াই আমাদের সময়ের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আজ অর্ধেক বিশ্ব অনলাইনে। বাকি অর্ধেক যেন অফলাইনে না থাকে সেটা নিশ্চিত করার এখনই সময়। সবাইকে সমতা, সুযোগ ও সৃজনশীলতার দিকে নিয়ে যায় এমন ওয়েবে যেন সবাই অবদান রাখে।

ওয়েবের এই চুক্তি যেন কোনো সাময়িক সমাধান না হয়। অনলাইন কমিউনিটির সাথে আমাদের সম্পর্ককে আমরা কীভাবে দেখি তার পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করার প্রক্রিয়া এই চুক্তি। এটি মনে হয় পরিষ্কার যে সামনের দিনের পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নিতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যেন দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সাথে তাল মেলানো যায়। এটি আমাদের ডিজিটাল কৈশোর থেকে আরো পরিণত ও দায়িত্বশীল ভবিষ্যতের দিকে যাত্রা।

ওয়েব সবার জন্য এবং সমষ্টিগতভাবে আমরাই একে পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখি। এটি হয়তো সহজ হবে না। তবে আমরা যদি অল্প স্বপ্ন দেখি এবং অনেক বেশি কাজ করি, তাহলেই আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত ওয়েবকে পাব।

– অনুবাদঃ মোশারফ হোসেন [ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্যার টিম বার্নার্স-লি রচিত মূল লেখাটি আছে এখানে – https://bit.ly/2VRCKWb]

উত্তর দিন