ইন্টারনেট ডটঅর্গ ও নেট নিউট্রালিটি নিয়ে বিতর্ক

1 113

সুবিধাবঞ্চিতদের কাছে স্বল্পমূল্যের ডিভাইসেও ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে ফেসবুকের উদ্যোগ ইন্টারনেট ডটঅর্গ (Inteet.org)। কিন্তু ইন্টারনেটে সব ধরনের সেবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ধারণার সাথে একে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন অনেকেই। উদ্ভাবনের পর ইন্টারনেটকে সকলের জন্য উন্মুক্ত রাখার মূল কারণই ছিল সকলের জন্য ইন্টারনেটে সমান অ্যাকসেস বজায় রাখা। নেট নিউট্রালিটি মূলত সেই ধারণাকেই ধারণ করে থাকে। কিন্তু বিশেষ বিশেষ কোম্পানির জন্য ইন্টারনেটের পৃথক সংযোগ চালু করার ধারণা নেট নিউট্রালিটির পরিপন্থী হওয়ায় প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও এর বিরোধিতা করে আসছে। নেট নিউট্রালিটিকে সমর্থন করলেও এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় সাইট ফেসবুক চালু করেছে ইন্টারনেট ডটঅর্গ। ইন্টারনেটের সংযোগ থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে বিনামূল্যে ইন্টারনেটের সেবা পৌঁছে দিতে ইন্টারনেট ডটঅর্গ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, এমনটিই মন্তব্য ফেসবুকের। কিন্তু এখানে কেবল অনুমোদিত কিছু সেবা যুক্ত হতে পারে বলে তা নেট নিউট্রালিটির সাথে সাংঘর্ষিক। ইন্টারনেট ডটঅর্গ তাই পড়েছে বিতর্কের মুখে। নেট নিউট্রালিটির সাথে ইন্টারনেট ডটঅর্গ কীভাবে সাংঘর্ষিক, সেটাই তুলে ধরা হলো এই লেখায়।

সকল সেবার সুযোগ সমান নয়
প্রাথমিকভাবে সীমিত আকারে যাত্রা শুরুর পর প্রসার লাভ করতে শুরু করেছে ইন্টারনেট ডটঅর্গ। সেইসাথে এই প্ল্যাটফর্মকে বিভিন্ন অনলাইন সেবার জন্য উন্মুক্তও করে দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্ল্যাটফর্মে কেবল সেসব অনলাইন সেবা বা ওয়েবসাইটই যুক্ত হতে পারবে, যেগুলো ফেসবুক এবং ফেসবুকের সাথে চুক্তিবদ্ধ টেলিকম অপারেটর অনুমোদন করবে। এর ফলে ইন্টারনেট ডটঅর্গ সার্বিকভাবে সকল ধরনের সেবার জন্য উন্মুক্ত না হয়ে সীমিতসংখ্যক কিছু ওয়েবসাইট বা অনলাইন সেবার জন্য উন্মুক্ত হবে এবং এতে করে ইন্টারনেটের বিভিন্ন ওয়েবসাইট বা সেবার মধ্যে বিভাজন তৈরি হবে।

ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবায় বৈষম্য
ইন্টারনেট ডটঅর্গ যাত্রার শুরুতেই যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা হলো—এই প্ল্যাটফর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের ওয়েবসাইট বা অনলাইন সেবায় অ্যাকসেস করা যাবে বিনামূল্যে। সুবিধাবঞ্চিতদের কথা মাথায় রেখে এই মডেলটি ডিজাইন করা হলেও অন্য ক্ষেত্রে এটি বৈষম্য তৈরি করছে। সকল সেবা ইন্টারনেট ডটঅর্গ প্ল্যাটফর্মের জন্য উন্মুক্ত হবে না বলে এতে অন্তর্ভুক্ত ও এর বাইরের সেবাগুলোর মধ্যে বৈষম্য তৈরি হবে। একই ধরনের সেবা ইন্টারনেট ডটঅর্গে বিনামূল্যে পাওয়া যাবে বলে এদের প্রতিদ্বন্দ্বী সেবাগুলো অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার করতে হলে সেগুলো অসুবিধায় পড়বে।

নিয়ন্ত্রণ ফেসবুক ও টেলিকম অপারেটরের হাতে
আলাদাভাবে ইন্টারনেটে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও ইন্টারনেট ডটঅর্গ উদ্যোগটি সেই ধারাকে ব্যহত করবে। কেননা এই প্ল্যাটফর্মের আওতায় কোনো ওয়েবসাইট বা সেবাকে আসতে হলে তাকে ফেসবুক এবং ফেসবুকের সাথে সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটর কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। এতে করে ফেসবুক এবং সংশ্লিষ্ট অপারেট প্রকৃত অর্থে ইন্টারনেট ডটঅর্গ প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়াবে। ফলে তারা চাইলেই যেকোনো ওয়েবসাইট বা সেবাকে তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে বের করে দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যাবে, যা ইন্টারনেটের মূলনীতির একেবারেই বিরোধী।

Green Hosting

নজরদারির সুযোগ
ইন্টারনেট ডটঅর্গের আরেকটি বড় সমস্যা হলো এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীরা কখন কী করছেন, তার সবকিছুতেই নজরদারি করার সুযোগ পাবে ফেসবুক এবং টেলিকম অপারেটর। প্রকৃতপক্ষেই ইন্টারনেট ডটঅর্গে কোন ব্যবহারকারী কোন সাইট বা কোন সেবাটি কখন ব্যবহার করছেন, তার সকল তথ্যই থাকবে ফেসবুক এবং তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ টেলিকম অপারেটরের কাছে। এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা নথি থেকে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে করে ইন্টারনেট ডটঅর্গের ব্যবহারকারীদের সংবেদনশীল এসব তথ্য পরবর্তী সময়ে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর হাতে চলে যাওয়াও অসম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে মূলত ফেসবুকের এই প্ল্যাটফর্মটি নজরদারির মাধ্যমে পরিণত হতেই পারে।

লেনদেনে নিরাপত্তাহীনতা
এইচটিটিপিএস এবং এনক্রিপ্টেড কনটেন্ট সমর্থন না করায় ইন্টারনেট ডটঅর্গের মাধ্যমে যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন অনিরাপদ হয়ে উঠবে। ই-কমার্সের এই যুগে এসে মূলধারার ব্যাংকিংও হয়ে উঠেছে অনলাইন-নির্ভর। তাছাড়া অনলাইনে কেনাকাটার জন্য অনলাইন পেমেন্টের প্রসারও ঘটেছে অনেকটাই। কিন্তু সুরক্ষিত প্রটোকল সমর্থন না করায় ইন্টারনেট ডটঅর্গে এসব সেবার কোনোটিই ব্যবহার করা যাবে না। এনক্রিপ্টেড তথ্য সমর্থন না করায় এই প্ল্যাটফর্মে কোনো ধরনের তথ্যই সুরক্ষিত রাখার কোনো ব্যবস্থাই নেই।

কনটেন্টে বৈষম্য
ইন্টারনেট ডটঅর্গের মাধ্যমে লো-এন্ড ডিভাইসেও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রাখার চিন্তা থেকে উচ্চ রেজ্যুলেশনের ছবি, ভিডিও বা মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট ব্যবহারের সুযোগ নেই এই প্ল্যাটফর্মে। এ ছাড়া ইন্টারনেট ডটঅর্গের নীতিমালা অনুযায়ী ভয়েজ কলিং বা ফাইল ট্রান্সফার করার উপযোগী সেবাগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় ফেলা হয়েছে। ফলে বলতে গেলে ইন্টারনেট ডটঅর্গের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ওয়েবসাইট ও অনলাইন সেবার একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী তৈরি হয়ে যেতে পারে বলে আশংকা করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা। এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের বদলে বরং ব্যবহারকারীদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ডাটা অ্যাকসেস দিয়ে তাদের কনটেন্টের স্বাধীনতা দেওয়াটা অধিক যুক্তিযুক্ত হতে পারতো বলেই মত দিয়েছে তারা।

Green Hosting

তথ্যসুত্র ও সংগ্রহঃ এখানে

লেখিকা- সানজিদা সুলতানা, দৈনিক ইত্তাফাক।

1 টি মন্তব্য
  1. Hossain Miraz বলেছেন

    ডগ আর্গ নিয়ে এত কাহীনা কেন?

উত্তর দিন