ছেলের অকৃত্রিম ভালবাসা মায়ের জন্য ( মা ও ছেলে গল্প)

0 427

মা কথাটি এমন মধুর যার তুলনা নেই। ছেলে এর মাথায় বৃদ্ধ মা ৭ মাইল পথ মাথায় নিয়ে হাঁটেন বীরেন্দ্র নাথ মজুমদার। একদিন দু’দিন নয়। বছরের পর বছর । মায়ের ভালবাসা এর কাছে কষ্ট আর ক্লান্তি যেন অসার। শতবর্ষী মায়ের সেবা করতে নিজে সংসার গড়েননি। মা ছেলে ভালবাসা এক অন্য রূপ, মা কে ছেড়ে যান না দূরে কোথাও। পরের জমিতে কাজ করে যা আয় করেন তা দিয়েই মাকে নিয়ে দিন পার করেন বীরেন্দ্র। তাতে তার হায় আপসোস নেই। বীরেন্দ্র এ মাতৃভক্তি এতদিন ছিল শুধু বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার অজপাড়া গাঁয়ের চণ্ডিপুর গ্রামের মানুষই জানতেন। কিন্তু সমপ্রতি একটি টিভি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মায়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসার এ কাহিনী ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের কাছে। দারিদ্র্যক্লিষ্ট বীরেন্দ্র সমাজের উচ্চাসনের কেউ না হলেও মানুষের কাছে অনন্য এক নজির সৃষ্টি করেছেন তিনি। মাকে ভালবেসে বীরেন্দ্র কেড়ে নিয়েছেন অজস্র মানুষের চোখের জলভেজা ভালবাসা। ওয়ায়েজ করনি, হযরত বায়েজিদ বোস্তামির মাতৃভক্তি দৃষ্টান্ত এখনও মানুষের কাছে ভালবাসার অকৃত্রিম নিদর্শনই তুলে ধরে। রামায়ণের কাহিনী অনুযায়ী অন্ধ পিতা-মাতাকে কাঁধে করে বয়ে বেড়াতেন তাদের পুত্র সিন্ধু মণি। সে ভালবাসার কাহিনী এখনও ঘুরে ফিরে আসে মানুষের মুখে। বীরেন্দ্রের মাতৃপ্রেমও অনন্য এক দৃষ্টান্ত বলে মনে করেন স্থানীয় লোকজন।

Chele o Ma
Ma O Chele

পিরোজপুর জেলার জিয়ানগর উপজেলা থেকে প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন মোড়েলগঞ্জ উপজেলার চণ্ডিপুর গ্রাম। দুই উপজেলার সীমান্তবর্তী এ গ্রামে যাতায়াত করাটা খুবই দুষ্কর। মাটির রাস্তায় প্রায় ৭ কিলোমিটার হেঁটে যাতায়াত করতে হয় জিয়া নগরে। বর্ষায় এ রাস্তায় চলাচল করতে হয় হাঁটু সমান কাদা মাড়িয়ে। রিকশা-ভ্যান চলে না। চললেও ভাড়া দিতে হয় অনেক। এত বাধা আর কষ্টের পথেও দুর্দমনীয় বীরেন্দ্র। অসুস্থ মাকে নিয়ে নিয়মিত তিনি যাতায়াত করেন জিয়া নগরে। তবে রিকশা কিংবা ভ্যানে করে নয়। বীরেন্দ্র হাঁটেন আর মা উষা রানী থাকেন তার মাথায়। বিশেষ ধরনের একটি টুকরিতে কাঁথা-কম্বল জড়িয়ে মায়ের জন্য আরাম আসন তৈরি করে মাথায় তোলেন সেই টুকরি। তাকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান আবার, ফিরে আসেন। বীরেন্দ্রের এ বীরত্বপূর্ণ পথচলা দেখে আবেগ আপ্লুত হন এলাকার মানুষ। বীরেন্দ্রের বড় ভাই বিবাহিত। কিন্তু বীরেন্দ্র বিয়ে করেননি। ভাইকে নিয়ে একসঙ্গেই থাকেন। দুই ভাই-ই মায়ের যত্ন করেন। মায়ের সেবার বিষয়ে বীরেন্দ্র বলেন, মায়ের পেট থেকে আমার জন্ম। আমার মা চলতে পারেন না। তাই তাঁকে মাথায় নিয়ে আমি চলি। মায়ের আশীর্বাদেই আমি বেঁচে আছি। সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি প্রার্থনা করি আমার মা যেন আরও অনেক দিন বাঁচেন, তাকে মাথায় নিয়ে যেন চিকিৎসকের কাছে যেতে পারি। শতবর্ষী উষা রানী ছেলের ভালবাসায় মুগ্ধ। তার মুখে কোন ভাষাই নেই। অশ্রুভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, বীরেন্দ্র আমার ছেলে নয়, ও যেন দেবদূত। এমন ছেলের মা হয়ে আমি গর্বিত। জিয়া নগরের ব্যবসায়ী খলিলুর রহমান জানান, বীরেন্দ্র তার মাকে মাথায় নিয়ে এখানে আসেন। তাকে দেখে মনটা ভালবাসায় ভিজে যায়। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জাগে। এ ব্যবসায়ী বলেন, বীরেন্দ্র আমাদের এলাকার গর্ব।
জিয়া নগরের পল্লী চিকিৎসক মিজানুর রহমান চিকিৎসা করেন উষা রানীর। তিনি বলেন, উষা রানী বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। আর্থিক অনটনের কারণে ভাল কোন চিকিৎসকের কাছে মাকে নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য নেই। তবে মিজানুর রহমান যত্নের সঙ্গে চিকিৎসা করেন উষা রানীর। তিনি বলেন, বীরেন্দ্রনাথ মজুমদার প্রায়ই তার অসুস্থ মাকে মাথায় বহন করে নিয়ে আসেন আমার কাছে। তার সুচিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। যা তার ছেলের বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, বার্ধক্যজনিত অসুখে ভুগছেন উষা রানী। তার একেক সময় একেক ধরনের অসুখ হয়। এ কারণে প্রায়ই নিয়ে আসতে হয়। তবে নিয়মিত চিকিৎসার কারণে তিনি এখনও সুস্থ আছেন। এদিকে পরিবারের দাবি, উষা রানীর বয়স ১১০ বছর। তবুও বয়স্কভাতা জোটেনি তার ভাগ্যে। বীরেন্দ্র মজুমদার জানান, বয়স্কভাতার জন্য আগে অনেকবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কেউ তাদের সাহায্য করেনি। তিনি বলেন, দুই উপজেলার সীমান্ত এলাকায় হওয়ায় জনপ্রতিনিধিরাও এখানে খুব একটা আসেন না। এ কারণে এ এলাকার মানুষ এমনিতে বঞ্চিত।

অনেক কথার গুঞ্জন শুনি অনেক গানের সুর সবচেয়ে ভালো লাগে যে আমার মাগো ডাক সুমধুর।

উত্তর দিন