তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনের বাংলাদেশ অধ্যায়

0 50

মোস্তাফা জব্বার : ৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এই দেশটাতে যত শিল্প কল-কারখানা ছিল তার সবই জাতীয়করণ করা হয়েছিল। যার অন্যতম কারণ সেইসব কারখানার মালিকেরা কেউ বাংলাদেশের অধিবাসী ছিল না। সেজন্য জন্ম হয় সেক্টর কর্পোরেশনগুলোর।

সেই সময়ে আমরা কাপড় কাচার সাবানও নিজেরা বানাতে পারতাম না। তবে বিগত দিনগুলোতে ধীরে ধীরে আমরা শিল্প কল কারখানার দিকে এগিয়ে আসছি। আমাদের নিত্যপণ্যের উৎপাদনে আমরা বেশ অগ্রসর। ঔষধ, পোশাকসহ অনেক ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন প্রশংসনীয়।

কম্পিউটারের বিষয়টা আরও ভিন্ন মাত্রার। সেই ৬৪ সালে বাংলাদেশে কম্পিউটার আসে বাইরে থেকে। সেই থেকেই কম্পিউটারের সকল কিছু আমরা আমদানিই করে আসছি। অন্যদিকে, সুইডেনের ভলভো কোম্পানির জন্য আমরা সফটওয়্যার বানিয়ে দিলেও নিজের দেশের সফটওয়্যারের বাজারটা প্রায় সকল ক্ষেত্রেই বিদেশীদের হাতে চলে গেছে। বিশেষ করে সরকারের বড় বড় কাজ ও ডিজিটাল রূপান্তরের কাজগুলো আমরা নিজেরা করার সুযোগ পাই না। এই ধারাবাহিকতায় ব্যতিক্রম ঘটান দেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা।

‘আমরা বাংলাদেশে কম্পিউটার বানাবো এবং সেই কম্পিউটার বিদেশে রপ্তানি করবো।’ স্বপ্ন, ইচ্ছা, নির্দেশনা বা আদেশ যাই বলিনা কেন, এটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলার স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনার বক্তব্য। ৬ই আগস্ট ২০১৫ ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের বৈঠকে তিনি এই ঘোষণা প্রদান করেন।

এমন স্বপ্নটা তিনি ২০১১ সালেও দেখেছিলেন, যখন তিনি বাংলাদেশের নিজস্ব পণ্য দোয়েল ল্যাপটপের উদ্বোধন করেন। পরনির্ভরশীল একটি দেশকে স্বনির্ভর করার এমন অদম্য ইচ্ছা বাংলাদেশের আর একজন মাত্র সরকার প্রধানের ছিল। তিনি শেখ হাসিনার পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর। দুর্ভাগ্যক্রমে বঙ্গবন্ধু সেই পরিমাণ সময় পাননি যাতে তিনি বাংলাদেশকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে পরিণত করতে পারেন। তবে আমাদের সৌভাগ্য যে বঙ্গবন্ধুকে হারানোর একুশ বছর পর আমাদের সোনার মেয়ে শেখ হাসিনা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করা শুরু করেন।

শুধু কম্পিউটার বানাবার স্বপ্নের কথা কেন বলবো, তথ্যপ্রযুক্তির সকল খাতে সমৃদ্ধি বা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন কিংবা নিজের টাকায় পদ্মা সেতু বানানোর যেসব দুঃসাহসী কাজ তিনি করে চলেছেন তাতে তাঁর দেখানো পথেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রচিত হবে-এটি বলতে আমার নিজের কোন দ্বিধা নেই। দেশবাসীরও নেই।

২০১৫ সালের ৬ই আগস্ট অনুষ্ঠিত পুনর্গঠন করা ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের প্রথম সভায় তিনি কম্পিউটার বানানোর ও রপ্তানির কথা বলেন। যেহেতু আমি সেই সভাতে উপস্থিত ছিলাম সেহেতু এর প্রেক্ষিতটির বিবরণও আমি দিতে পারি। সেদিন অনেক সময় ধরে তথ্যপ্রযুক্তির সামগ্রিক বিষয় নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হচ্ছিলো। চমৎকার এজেন্ডা ছিলো সভার। এজেন্ডার বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তও দিচ্ছিলেন। সভা প্রায় শেষ স্তরে ছিলো। আমি তার অনুমতি নিয়ে বিবিধ আলোচ্যসূচিতে একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার সুযোগ পাই। আমি তাকে জানাই যে, আমরা শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তরের কথা বলছি। প্রধানমন্ত্রী আপনি নিজে প্রত্যাশা করেন যে, আমাদের সকল ছাত্র ছাত্রী ল্যাপটপ হাতে নিয়ে স্কুলে যাবে। আপনি যদি সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়িত করতে চান তবে এখনকার পরিস্থিতিতে আপনাকে কমপক্ষে ৪ কোটি ডিজিটাল ডিভাইস আমদানি করতে হবে। প্রতিটি ল্যাপটপের দাম যদি ৩০ হাজার টাকা করেও হিসাব করেন তবে একটু ভেবে দেখুন এর ফলে আমরা কি পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এই খাতে বিদেশে পাঠাবো। আমাদের উচিত আমদানিকারক থেকে উৎপাদক হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা।

আমার প্রস্তাবনার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী কোন মন্তব্য করার আগেই অনেকে বললেন, বাইরে থেকে আমদানি করলে কম্পিউটারের দাম কম পড়ে। আমরা দোয়েল করে ব্যর্থ হয়েছি সেটিও অনেকে বললেন। আমাদের দক্ষতা নেই। মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই। প্রধানমন্ত্রী সবাইকে উজ্জীবিত করে তখন বলেন যে, আমরা কম্পিউটার বানাবো এবং রপ্তানিও করবো। তিনি সেই দিনই ঠেসিসের দায়িত্ব আমার হাতে দেবার নির্দেশও দিলেন। ঘটনাচক্রে বিষয়টি সেই সভার মিনিটসে আসেনি। তবে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নটি আমার মতো আরও অনেকের কাছে একটি প্রয়োজনীয় ও বাস্তবিক উদ্যোগ বলে মনে হয়।

১৯৬৯ সালের ইন্টারনেট বা ৯১ সালের ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের স্তরটাতে আমরা যুক্ত হই ২০০৬ সালে। ২০০৮ সালে আমাদের দেশে মাত্র ১২ লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিলো।  আশির দশক থেকে এখন অবধি বাংলাদেশী ব্রান্ডের কিছু কম্পিউটারের খবর আমরা জানি। কয়েকটির কথা আমি স্মরণ করতে পারি।

বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সাবেক মহাসচিব মুনিম হোসেন রানার এক্সেস পিসি, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সাবেক সভাপতি জনাব সবুর খানের ডেফোডিল পিসি, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সদ্য সাবেক সভাপতি জনাব এ এইচ এম মাহফুজুল আরিফের সিএসএম, ফ্লোরা লিমিটেডের ফ্লোরা পিসি ও আনন্দ কম্পিউটার্সের আনন্দ পিসিসহ অনেকেই নানা নামে ক্লোন পিসি বাজারজাত করেছেন। বেসরকারি ক্রেতাদের ডেস্কটপ পিসির বাজারটা প্রধানত ক্লোন পিসির দখলে। যদিও আমাদের নিজস্ব একটি ব্রান্ড গড়ে ওঠেনি তথাপি ডেস্কটপ পিসির জগতে আমাদের নিজেদের হাতে সংযোজন করা পিসির দাপটই প্রধান। কেবলমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো গুণগত মানের নামে ব্রান্ড পিসি কিনে থাকে। এই হীনমন্যতার জন্য কোন দেশীয় ব্রান্ড বিকশিত হতে পারেনি। তবে বেসরকারি খাতে ব্র্যান্ড ডেস্কটপ পিসি কেউ কেনেই না।

ল্যাপটপ যখন জনপ্রিয় হতে থাকে তখন ডেস্কটপ পিসির এই বাজারটি সংকোচিত হতে থাকে। ল্যাপটপের কোন ক্লোন দেশে তৈরি হচ্ছিলো না। তবে ব্যতিক্রম হচ্ছে সরকারের টেলিফোন শিল্প সংস্থার দোয়েল ল্যাপটপ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দোয়েল তার প্রথম চালানে বদনাম কামাই করে। পণ্যের গুণগত মান নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। এর বাইরেও দোয়েলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন দেখা দেয়।

কিন্তু পরবর্তীতে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ দোয়েল ল্যাপটপ কিনে অনেক ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড ল্যাপটপের চাইতেও ভালোভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়। কিন্তু সেই যে একবার বদনাম কামাই করা হলো তার ফলে দোয়েল বেসরকারি ক্রেতাদের কাছে কোনো আকর্ষণই তৈরি করতে পারেনি। অন্যদিকে সরকারি কেনাকাটায় প্রথমেই বলা হয়ে থাকে যে, আন্তর্জাতিকভাবে বিখ্যাত ব্র্যান্ড হতে হবে। দোয়েল সেই সীমা অতিক্রম করতে পারে না। কারণ সেটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি যোগাড় করতে পারেনি। বাজারজাতকরণে এই প্রতিষ্ঠানটির চরম দুর্বলতাও এজন্য চরমভাবে দায়ী। এই বিষয়টি আমরা অন্য কোনো সময়ে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে পারি।

যা হোক প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বস্তুত একটি জাতীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করেছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ অর্থ মন্ত্রণালয়কে অফিসিয়ালি কিছু সুপারিশ করেছে। এই বিভাগের সাবেক সচিব জনাব শ্যামসুন্দর সিকদার ৩০ মার্চ ১৬ অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সরকারের সচিবদের বৈঠকে যে ধরনের প্রস্তাবনা পেশ করেছিলেন সেটি হচ্ছে, ‘বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের এই সময়ে এখন প্রয়োজন দেশীয় পণ্যকে পৃষ্ঠপোষকতা করা।’ তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিলো, ৯৮/৯৯ সালের বাজেটে কম্পিউটারের শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহারের ফলে কম্পিউটারের ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু এখন সেই চাহিদা পূরণে হাজার হাজার কোটি টাকা আমদানি ব্যয় হচ্ছে। আগামীতে দেশের সরকারি অফিস-আদালত ও ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষার জন্য ডিজিটাল ডিভাইস দিতে হলে লক্ষ কোটি টাকার আমদানি করতে হবে। এখন প্রয়োজন স্মার্টফোন, ট্যাব, কম্পিউটারের দেশীয় উৎপাদনকে সহায়তা করা। আমাদানিকারক থেকে উৎপাদকে পরিণত হওয়া। ৬ আগস্ট ১৫ প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের সভায় এসব কথাই বলেছেন।

ক) এর জন্য সম্পূর্ণ উৎপাদিত কম্পিউটার পণ্যের ওপর করারোপ ও ভ্যাট আদায় করা যায়। যন্ত্রাংশ বা কাঁচামালকে শুল্ক ও ভ্যাট মুক্ত করা যায়। এতে দেশের রাজস্ব বাড়বে এবং ডিজিটাল যন্ত্র দেশে উৎপাদিত হবে। বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।

খ) সফটওয়্যারের মতো হার্ডওয়্যার উৎপাদনকেও কর সুবিধা প্রদান করা যায়।

গ) সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদেশী ব্রান্ড কেনার বদলে দেশীয় ব্র্যান্ড ডিজিটাল ডিভাইস কেনার বিধান করা যায়। এর মান পরীক্ষা করার দায়িত্ব আইসিটি ডিভিশন নিতে পারে।

সচিব মহোদয় দেশীয় সফটওয়্যারের বিষয়েও তার বক্তব্য পেশ করেন। তিনি বলেন, ‘দেশীয় সফটওয়্যার ও সেবা খাত বড় হতে পারছে না কারণ তারা দেশে কাজ করতে পারে না। বিদেশী সহায়তার বড় প্রকল্প করার ক্ষমতা তাদের নাই, টেন্ডারেও ওরা অংশ নিতে পারে না। সরকারি কাজে দেশী প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে’। প্রসঙ্গত তিনি এই কাজগুলোর সমন্বয়ের দায়িত্ব আইসিটি বিভাগকে দেবারও অনুরোধ করেন।

সচিব মহোদয় অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাবার পর বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সঙ্গে কথা বলেন। সমিতির পক্ষ থেকে ৩১ মার্চ ১৬ অর্থ মন্ত্রী, আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও আইসিটি বিভাগের সচিব শ্যামসুন্দর সিকদারের কাছে একটি পত্র লেখা হয়। তাতে দেশীয় শিল্পকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়। সমিতির সাবেক সভাপতি জনাব এ এইচ এম মাহফুজুল আরিফ স্বাক্ষরিত এই পত্রে যেসব প্রস্তাবনা পেশ করা হয় সেগুলো হচ্ছে-

১. ডিজিটাল পণ্য তথা কম্পিউটার/ল্যাপটপ/ট্যাব উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় বেশ কয়েকটি মৌলিক যন্ত্রাংশ। এগুলো কোনো দেশ বা কোম্পানি একক ভাবে উৎপাদন করে না। আমদানি করে অ্যাসেম্বেলের মাধ্যমে নিজস্ব ব্র্যান্ড নামে বাজারে অবমুক্ত করে। ফলে দেশের কম্পিউটার হার্ডওয়্যার শিল্প গড়ে তুলতে গেলে এসব যন্ত্রাংশ আমদানি পর্যায়ে ধার্যকৃত শুল্ক মুক্ত সুবিধা চালু করা দরকার।

২. ডিজিটাল পণ্য উৎপাদনের জন্য আধুনিক মানের প্লান্ট স্থাপন করতে হলে প্রয়োজন সুবিধাজনক জমি। তাই আমরা আশা করবো সকল ইউটিলিটি সুবিধা দিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্মাণাধীন হাইটেক পার্কে এ জন্য উৎপাদক কোম্পানিগুলোকে পর্যাপ্ত জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হবে।

৩. বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি দেশী ব্র্যান্ডের আইটি পণ্যকে ভোক্তা পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে মূল্য সংবেদনশীল থাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। তাই আইটি পণ্য ও সেবা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি বিক্রির আগেই উৎপাদিত পণ্যে অ্যাডভান্স ট্রেড ভ্যাট (এটিভি) দিতে হয় তবে তা শুধু চ্যালেঞ্জেরই নয় বিনিয়োজিত পুঁজি ঝুঁকির মুখে পড়ে।

৪. স্থানীয় বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার স্বার্থে ভোক্তা পর্যায়ে এসব পণ্যকে সহজলভ্য করে তুলতে হলে দেশী উৎপাদিত পণ্য খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ ও বিক্রির ক্ষেত্রে সকল প্রকার ট্যাক্স ও ভ্যাট মুক্ত রাখতে হবে।

৫. দেশী উৎপাদক আইটি কোম্পানিগুলো যেন চাপমুক্ত হয়ে পণ্য বাজারজাতকরণে প্রণোদনা চালাতে পারে এবং দ্রুত বাজার সম্প্রসারণ করতে পারে সেজন্য তাদের অর্জিত আয়কে করমুক্ত রাখার দাবি জানাচ্ছি।

৬. দেশে ব্যবসারত আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানে মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্তত ১০ বছরের জন্য ট্যাক্স হলিডে সুবিধা চালু করা দরকার।

৭. একইভাবে এই খাতকে পোশাক শিল্পখাতের মতো সমৃদ্ধ করতে হলে দেশে উৎপাদিত আইটি পণ্যে রপ্তানির ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ক্যাশ ইনসেনটিভ চালু করতে হবে।

৮. আমাদের দেশে শ্রমিক/কর্মীর প্রাচুর্য থাকলেও প্রযুক্তি দক্ষ মানবসম্পদ মোটেই সমৃদ্ধ নয়। ডিজিটাল শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান এই বাধা অতিক্রমের জন্য কারিগরি ও ব্র্যান্ডিং বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য একটি বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা যেতে পারে।

৯. সর্বোপরি দেশের বাজার পেরিয়ে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড আইটি পণ্যের বৈশ্বিক বাজার ধরতে সিবিট এর মতো আন্তর্জাতিক মেলাগুলোতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করি।

এসব প্রস্তাবনায় মূলত উৎপাদিত পণ্যের যন্ত্রাংশ আমদানি শুল্ক, উৎপাদিত পণ্যের ওপর এটিভি, খুচরা পর্যায়ে সরবরাহ ও বিক্রির ওপর শুল্ক ও কর ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের আয়কর খাতে শূন্য ব্যবস্থা প্রচলনের অনুরোধ করা হয়। এছাড়াও ১০ বছরের কর রেয়াত, শতকরা ৫ ভাগ নগদ ইনসেনটিভ, বিশ্ব মেলা সমূহে শতভাগ সমর্থন ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট স্থাপনের দাবি করা হয়।

কিন্তু দুঃখজনক দিক হলো সেবারের বাজেটে এসব সুপারিশের কোন প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে ডিজিটাল যন্ত্র স্বদেশে উৎপাদন করার সুবিধাজনক অবস্থাটি তখন হয়নি। বিষয়টি এরপর সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরা সম্ভব হয় ১৬ সালের ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। বেসিস এর পক্ষ থেকে আমি যে বিষয়গুলোকে প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনতে সক্ষম হই সেটির শীর্ষস্থানে ছিলো আমদানিকে নিরুৎসাহিত করে দেশের উৎপাদনকে সহায়তা করা। এইসব প্রস্তাবনা নিয়ে ২০১৭ সালে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ ও বেসিসসহ দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বাণিজ্য সংগঠনগুলো তাদের ১৭-১৮ সালের বাজেট প্রস্তাবনায় দেশীয় উৎপাদনকে সুরক্ষা দেবার দাবি তুলেছে।

আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো আমদানি করা পণ্যের দাম ছিলো যন্ত্রাংশের চাইতে বেশি। মোবাইলের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শতকরা ৩৭ ভাগ শুল্ক থাকলেও পুরো মোবাইল সেটের ওপর শুল্ক ছিলো শতকরা মাত্র ৫ ভাগ। এর ফলে দেশে মোবাইল সংযোজন করাও সম্ভব ছিলো না। এইবার ১৭-১৮ সালের বাজেটে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নকে তাই বাস্তবে রূপ দেয়া হয়। কর কাঠামোগত ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে এখন দেশে ডিজিটাল যন্ত্র উৎপাদন করা একটি লাভজনক বিষয়।

তবে সুখের বিষয় হচ্ছে এবারের বাজেটের জন্য বাংলাদেশ বসে থাকেনি। এরই মাঝে দেশের অন্যতম প্রধান ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদক ওয়ালটন ৯ সেপ্টেম্বর ১৬ থেকে দেশী ওয়ালটন ব্রান্ডের ল্যাপটপ বাজারে ছেড়েছে। ল্যাপটপটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে ২২ সেপ্টেম্বর ১৬। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এর উদ্বোধন করেন। একই প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ল্যাপটপ উৎপাদনের কারখানা তৈরি করছে। আগামী ডিসেম্বরে এটি চালু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এরই মাঝে ওয়ালটন তাদের স্মার্টফোন উৎপাদন শুরু করেছে। উই মোবাইল কোম্পানি নভেম্বরে তাদের কারখানা চালু করছে। সিম্ফনি তাদের কারখানা চালু করতে যাচ্ছে। এমনকি বিশ্বখ্যাত কিছু ব্র্যান্ডও দেশে কারখানা স্থাপনের কথা ভাবছে। ওয়ালটন পুরো বিষয়টিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। তারা এখন ট্যাব-কিবোর্ড, মাউস, পেনড্রাইভ, ডেস্কটপ পিসি বাজারজাত করছে। এমনকি তারা স্মার্ট টিভি ও আইওটি ফ্রিজ বাজারজাত করছে।

এবারের বাজেটে তথ্যপ্রযুক্তি পণ্যকে রপ্তানি ক্ষেত্রে সহায়তা দেবার যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেবার ফলে কেবল যে দেশীয় কল কারখানার জন্য সহায়ক হয়েছে সেটাই নয়, বরং আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোও এখানে উৎপাদন করে বাইরে রপ্তানি করার ক্ষেত্রে উৎসাহ পাব।

এর ফলে দেশটি আমদানিকারক থেকে উৎপাদক ও রপ্তানিকারকের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। আমি মনে করি এরই ধারাবাহিকতায় আমরা শিল্পযুগের তিনটি স্তর মিস করেও চতুর্থ স্তরে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় রাখতে পারবো।

লেখক তথ্যপ্রযুক্তিবিদ  ও বেসিস সভাপতি।  ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্স  সদস্য। সাবেক বিসিএস সভাপতি।দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস এর চেয়ারম্যান  বিজয় কিবোর্ড  সফটওয়্যারের প্রণেতা

মেইল : [email protected]

ওয়েবপেজ : www.bijoyekushe.net

Leave A Reply