ইন্টারনেট ড্রাগ এর আসক্তি ও সমাধান

0

আজ থেকে দশ-বারো বছর আগে কম্পিউটার নিয়ে যারা বেশির ভাগ সময় কাটাতেন তারা ছিলেন প্রধানত তথ্যপ্রযুক্তির লোক এবং সেই সময়টুকুর জন্য তাদেরকে বেতন-ভাতা দেওয়া হতো।

ইন্টারনেটের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ কম্পিউটার নিয়ে বেশির ভাগ সময় কাটায় এবং সেই সময়টুকুর জন্য নিজেরাই মূল্য পরিশোধ করে। কম্পিউটার ও ইন্টারনেট আজ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সংবাদ, তথ্য, যোগাযোগ, কেনাকাটা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক, বিনোদন ইত্যাদি অনেক কিছুর জন্য মানুষ এখন ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু কেউ যদি ইন্টারনেটের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, ইন্টারনেটের কারণে যদি কারো স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হয় এবং সিগারেট, মদ ও ড্রাগের মতো ইন্টারনেটের প্রতি যদি কেউ আসক্ত হয়ে পড়ে তখনই সমস্যা। এক কথায় ইন্টারনেট আসক্তিকে রোধ করা বেশ কঠিন ব্যাপার। ইন্টারনেটকে কেন্দ্র করে মানুষের যে ব্যাপক কৌতূহল, সার্বক্ষণিক চিন্তা, অদমনীয় ইচ্ছা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং অসংযত আচরণবোধ এসব কিছুকেই ইন্টারনেট আসক্তি বলা যায়।

ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি আজকের যুগের একটি অত্যন্ত জটিল সমস্যা ও অভিশাপ। অন্যান্য নেশার মতোই এটি একটি সর্বনাশা নেশা, যা ব্যক্তির সামাজিক, পারিবারিক ও পেশাগত জীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। ইন্টারনেট ব্যতীত বর্তমান যুগে চলা অসম্ভব। আবার এর মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি জীবনকে ধ্বংস করে দেয়। কখন ইন্টারনেট অ্যাডিকশন বলব- মাথার মধ্যে যখন প্রধান চিন্তা থাকে ইন্টারনেট। সপ্তাহে ৩৮ ঘণ্টা বা তার বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করা। ইন্টারনেট ছাড়া থাকতে না পারা, বাদ দিতে গেলে দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা ও অন্যান্য সমস্যা আসা। মাত্রাতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে স্বাভাবিক, পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত জীবনকে ব্যাহত করা। ইন্টারনেট যদি হয় বিনোদনের প্রধান উৎস। ইন্টারনেটের ব্যবহার যারা লুকিয়ে রাখতে চান এবং তা নিয়ে মিথ্যা কথা বলেন। বাস্তব জীবনের চেয়ে ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জীবন যাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেট অ্যাডিকশনের প্রকারভেদ- সাইবার সেক্স। সাইবার রিলেশন প্রবলেম। পর্নোগ্রাফি। অনলাইন গ্যাম্বলিং বা জুয়া। ইন্টারনেট গেমিং। ফেসবুক আসক্তি। কম্পালসিভ ডেবিলিটেটিং ডিসঅর্ডার। এতে করে শারীরিক প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায় ঘাড় ও কোমরব্যথা, মাথাব্যথা এবং আই স্ট্রেন (চোখে অস্বাভাবিক চাপজনিত সমস্যা) হচ্ছে। মানসিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে- অনিদ্রা, অতিরিক্ত টেনশন বোধ, বিষণ্ণতা, যৌন সমস্যা, অপরাধপ্রবণতা, মনোযোগ কমে যাওয়া।

পারিবারিক সমস্যার মধ্যে রয়েছে- সম্পর্কের ভয়াবহ অবনতি। দাম্পত্য কলহের একটি প্রধান কারণ এখন ফেসবুক চ্যাটিং ও সাইবার সেক্স। বিশেষ করে কিশোরীরা সহজেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিভিন্ন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এটি আসলেই ঝুঁকিপূর্ণ। পেশাগত সমস্যার মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত টেনশন, বিষণ্ণতা, অনিদ্রার জন্য সারারাত নেট চালায়, সারাদিন ঘুমায়। স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়ে। এছাড়া ইন্টারনেট অ্যাডিকশনের একটি ভয়াবহ কারণ হচ্ছে পর্নোগ্রাফি। কেবল প্রাপ্তবয়স্করা নয়, কিশোর-কিশোরীরাও এখন এতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এটি মস্তিষ্ককে চরমভাবে উত্তেজিত করে। ফলে অবৈধ যৌনাচার, ধর্ষণের প্রবণতাজনিত ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একজন টিনএজার কখনই এই ভার তাদের মস্তিষ্কে বহন করতে পারবে না। ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয় দেখা দিয়েছে বর্তমান সমাজে পর্নোগ্রাফির ফলে। যদিও দৃশ্যাবলিতে ১৮+ লেখা থাকে, তবে সমাজে এই নিয়মের কোনো প্রতিফলন নেই। এর জন্য চিকিৎসাও রয়েছে। আসক্তদের তিনভাবে যথা সাইকোলজিক্যাল, ফিজিক্যাল ও সোশ্যালি চিকিৎসা দেয়া যায়। সাইকোলজিক্যালের মধ্যে রয়েছে সাইকো এডুকেশন : ইন্টারনেটের কুফল সম্পর্কে জ্ঞানদান, সেট আ লিমিট বা ইন্টারনেটের সীমিত ব্যবহার, ইন্টারনেটে আনন্দ না খুঁজে বাস্তব জীবনে আনন্দ বের করা। যেমন- গল্প করা, আড্ডা দেয়া, বাগান করা, ঘুরে বেড়ানো, বইপড়া ইত্যাদি। পরিবারকে অধিক সময় দেয়া, বিশেষ করে স্বামী ও স্ত্রীদের। পারিবারিক জীবনযাপন ইন্টারনেটে শেয়ার করাতে নিরুৎসাহিত করা। ইন্টারনেটের কুফল সম্পর্কে মিডিয়ার সহায়তায় জনসচেতনতা সৃষ্টি। বাস্তব জীবনকে অধিক গুরুত্ব দেয়া। কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখা। ফিজিক্যাল চিকিৎসা সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে মরবিডিটি মেন্টাল ইলনেস থাকলে টিসিএ, এসএসআরআই (বিষণ্ণতানাশক ওষুধ), বেঞ্জোডায়াজেপাইন (৩ সপ্তাহের বেশি নয়) ব্যবহার করা যেতে পারে। ভয়াবহ ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি করা যেতে পারে। এজন্য প্রয়োজন পড়বে দীর্ঘমেয়াদি কাউন্সেলিং, নিয়মিত ডক্টর ফলোআপ এবং মোরালিটি ইম্প্রুভমেন্ট (নৈতিক শিক্ষাদান)। এছাড়া উন্নত বিশ্বে ইন্টারনেট অ্যাডিকশন সেন্টার আছে। সময়ের প্রয়োজনে আমাদেরও এ উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের এ মানসিক রোগের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। যেন রোগীরা অন্তত চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ জীবনে ফিরে আসার সুযোগ পান।

যাদের ইন্টারনেটে আসক্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি 

  • যারা আগে থেকেই অন্য কোনো কারণে উদ্বেগে রয়েছেন।
  • যারা বিষণ্নতায় বা একাকিত্বে ভুগছেন।
  • যারা ড্রাগ, অ্যালকোহল, জুয়াখেলা এবং বিকৃত মানসিকতায় আসক্ত
  • টিনএজার, যারা রোমাঞ্চপ্রিয় ও সব কিছুতে অতি উত্সাহী।
  • শারীরিকভাবে যারা অলস ও ঘরকুনো।
  • যারা কোনো কিছুকেই হালকাভাবে নিতে পারে না, সব কিছুতেই সিরিয়াস।
  • বাস্তব জীবনে যাদের বন্ধু-বান্ধব খুবই কম ও বিপদ-আপদে সাহায্য করার মতো কেউ নেই।
  • যারা অসামাজিক, লাজুক এবং মানুষের সাথে মিশতে ভয় পায়।
  • যারা বাস্তব জীবনের সমস্যাকে এড়িয়ে চলতে চায়।

প্রতিকার

  • চিত্ত বিনোদনের অন্য উপায়গুলোর মাঝে নিজেকে পরিব্যাপ্ত করা
  • পরিবারের সাথে দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে আরও বেশি সময় দেওয়া
  • নিজের প্রকৃত দুঃখ-কষ্ট-সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করা এবং তা দূর করার জন্য সচেষ্ট হওয়া।
  • নিজের সমস্যাগুলো নিজের মাঝে গুটিয়ে না রেখে আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুবান্ধবের সাথে আলোচনা করা।
  • ইন্টারনেট প্রযুক্তিকে নিজের সহায়ক কাজেই একমাত্র ব্যবহার করা, নির্ভরতা যেন পারিবারিক বা সামাজিক গণ্ডিকে অতিক্রম না করে।
  • ড্রাগ, অ্যালকোহল বা অন্য কোনো মানসিক সমস্যা থাকলে তার চিকিত্সা করা।
  • বাস্তব জীবনে বেশি মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা। তখন ইন্টারনেটের সাথে সম্পর্ক কম থাকলেও চলবে।
  • অসামাজিক, লাজুক বা ঘরকুনো স্বভাব থাকলে তা পরিবর্তন করা।
  • প্রয়োজনে মানসিক বিশেষজ্ঞের দ্বারস্থ হয়ে চিকিত্সা নেওয়া।
  • ধাপে ধাপে ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় ও গুরুত্ব কমিয়ে আনা।

ফেসবুক থেকে মন্তব্যঃ

Leave A Reply